by Onger
June 24th 2026.
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের তৃতীয় তলায় একটি জানালা আছে — যেটির কাছে কেউ বসে না। কাচের ওপর পুরোনো বৃষ্টির দাগ, বাইরে একটি কৃষ্ণচূড়া, আর ভেতরে — কেবল নিস্তব্ধতা। আমি সেই জানালার কাছেই বসতাম। প্রতিদিন। যেন সেটি আমার জন্যই অপেক্ষা করতো, যেমন কিছু কিছু শূন্যতা কেবল একটি নির্দিষ্ট মানুষের জন্যই ফাঁকা থাকে।
সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি — যে বৃষ্টি শ্রাবণের মতো উদ্দাম নয়, বরং কিছুটা সংযত, কিছুটা ক্লান্ত, যেন সে নিজেও জানে তার ঋতু ফুরিয়ে আসছে। জানালায় ফোঁটা পড়ছিলো অসম ছন্দে। আমি পড়ছিলাম — কী পড়ছিলাম তা আজ আর মনে নেই, কারণ যা ঘটলো তার পরে বইয়ের অক্ষরগুলো অর্থ হারালো।
সে এসে বসলো পাশের চেয়ারে।
না, এভাবে বললে ভুল হবে। সে এসে বসলো না — সে এসে ঘটলো। যেমন আলো ঘটে একটি অন্ধকার ঘরে, তীব্র নয়, কিন্তু অস্বীকারের অযোগ্য।
তার হাতে ছিলো একটি বই — শামসুর রাহমানের কবিতাসমগ্র। মলাটটি ক্ষয়ে গেছে। কেউ যখন একটি বই এতটা পড়ে যে তার মলাট ক্ষয়ে যায়, তখন বোঝা যায় সে শব্দের ভেতর বাস করে। আমি বুঝলাম, এই মানুষটি শব্দের ভেতরে বাস করে। আর আমি — আমি তখন পর্যন্ত শব্দের বাইরে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিতাম মাত্র।
সে বইটি খুললো। একটি পাতায় থামলো। পড়লো না। কেবল তাকিয়ে রইলো — যেমন মানুষ এমন কোনো বাক্যে তাকিয়ে থাকে যেটি তাকে প্রথমবার পড়েনি, সে বাক্যটিকে পড়েছে।
আমি তার দিকে তাকাইনি। কিন্তু দেখেছিলাম। দেখা আর তাকানো এক নয় — তাকানো সচেতন, দেখা অনিবার্য।

পরদিন সে আবার এলো। একই চেয়ার। একই বই। কিন্তু এবার সে একটু আগে এসেছে — জানালার কাচে তখনো আগের রাতের বৃষ্টি শুকায়নি। আমি ভাবলাম, কাকতালীয়। মানুষ কাকতালীয়তায় অর্থ খোঁজে, কারণ অর্থহীনতা সহ্য করার ক্ষমতা তার সীমিত।
তৃতীয় দিনে সে এলো, আর আমি বুঝলাম এটি কাকতালীয় নয়। কাকতালীয়তা দুবার ঘটে, তিনবার ঘটলে তাকে অভ্যাস বলে — কিংবা অভিপ্রায়।
সেদিন সে কথা বললো। প্রথম কথা।
"জানালাটা সবসময় এত নোংরা থাকে?"
আমি বললাম, "নোংরা না। ওটা সময়ের স্বাক্ষর।"
সে হাসলো। হাসিটা শব্দহীন ছিলো — ঠোঁটে শুরু হয়ে চোখে গিয়ে শেষ হলো। আমি জীবনে অনেক হাসি দেখেছি — কিন্তু যে হাসি চোখে গিয়ে শেষ হয়, সেটি বিরল। সেটি বিপজ্জনক।
"তুমি কী পড়ো?" সে জিজ্ঞেস করলো।
"বাংলা।"
"সাহিত্য?"
"সাহিত্যই তো। বাংলা বলতে আর কী বোঝায়?"
সে আবার হাসলো। এবার হাসিটা চোখ পেরিয়ে কোথাও আরো গভীরে গেলো — যেখানে আমার পৌঁছানোর কথা ছিলো না।

তারপর দিনগুলো একটি নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করলো।
সকালে গ্রন্থাগার। তৃতীয় তলা। জানালার পাশে দুটি চেয়ার। মাঝখানে একটি টেবিল — যেটি যথেষ্ট চওড়া ছিলো দূরত্ব বজায় রাখতে, কিন্তু যথেষ্ট সংকীর্ণ ছিলো দূরত্বকে অর্থহীন করে দিতে। আমরা কথা বলতাম। শামসুর রাহমান থেকে জীবনানন্দ, জীবনানন্দ থেকে বিষ্ণু দে, বিষ্ণু দে থেকে কখন যে নিজেদের কথায় চলে আসতাম, টের পেতাম না।
সে বললো, "তুমি কি লক্ষ করেছো, জীবনানন্দের নায়করা সবাই একা?"
আমি বললাম, "একা নয়। তারা একাকী হতে চায় — কিন্তু পারে না। একা থাকা আর একাকী হওয়া আলাদা। একা থাকা পরিস্থিতি, একাকীত্ব — সিদ্ধান্ত। তার নায়করা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলেই এত সুন্দর।"
সে চুপ করে গেলো। অনেকক্ষণ।
তারপর বললো, খুব ধীরে, "সিদ্ধান্ত নিতে না পারাটাও কি একটা সিদ্ধান্ত?"
আমি উত্তর দিইনি। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না — দিলে সেগুলো প্রশ্ন থাকে না, আর প্রশ্ন না থাকলে যে উত্তর দেওয়া হলো সেটিও অর্থ হারায়। কিছু কিছু জিনিস স্থগিত অবস্থাতেই সবচেয়ে সুন্দর।

শীত এলো। কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরলো। জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যটি পাল্টে গেলো — আগে সবুজের ভেতর দিয়ে ছাকা আলো আসতো, এখন সরাসরি রোদ এসে টেবিলে পড়ে। রোদের একটি সমস্যা আছে — সে সবকিছু দেখিয়ে দেয়। ছায়া লুকোতে জানে, রোদ জানে না।
আমি লক্ষ করলাম, সে আর শামসুর রাহমান আনে না। সে অন্য বই আনে — নোটবই। লেখে। কী লেখে জিজ্ঞেস করিনি, কারণ কারো লেখা তার অনুমতি ছাড়া পড়া হলো তার ভেতরে অনধিকার প্রবেশ। আমি অপেক্ষা করলাম — সে নিজে দেখাবে।
সে দেখালো না।
কিন্তু একদিন, উঠে যাবার সময়, নোটবইটা রেখে গেলো। ভুলে? ইচ্ছে করে? ভুলে রেখে যাওয়া আর ইচ্ছে করে রেখে যাওয়ার মধ্যে তফাৎ ততটুকুই, যতটুকু তফাৎ বৃষ্টিতে ভেজা আর কান্নায় — বাইরে থেকে দেখলে একই রকম দেখায়।
আমি খুললাম না। সারারাত নোটবইটি আমার টেবিলে রইলো, বন্ধ — একটি অনুচ্চারিত বাক্যের মতো।
পরদিন ফিরিয়ে দিলাম।
সে জিজ্ঞেস করলো, "পড়োনি?"
"না।"
"কেন?"
"তুমি বলোনি পড়তে।"
সে আমার দিকে তাকালো। দীর্ঘক্ষণ। সেই তাকানোর মধ্যে একটি সম্পূর্ণ বাক্য ছিলো যা সে কখনো উচ্চারণ করলো না, আমি কখনো শুনলাম না — কিন্তু আমরা দুজনেই পড়লাম।

বসন্ত এলো। কৃষ্ণচূড়া আবার ফুটলো — এবার লাল নয়, কমলা। কী আশ্চর্য, একই গাছ প্রতিবছর একটু আলাদা রঙে ফোটে, যেন সেও পুনরাবৃত্তিতে বিরক্ত।
আমাদের মধ্যে কোনো শব্দ ছিলো না যেটি "এটি কী" — তা সংজ্ঞায়িত করতে পারে। প্রেম? বন্ধুত্ব? অভ্যাস? সহাবস্থান? শব্দ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করলে জিনিসটা ছোট হয়ে যায় — একটি নদীকে "জলপ্রবাহ" বললে তার জোয়ার, তার বন্যা, তার শুকিয়ে যাওয়া — কিছুই ধরা পড়ে না। আমরা নামহীন রইলাম। নামহীনতার একটা স্বাধীনতা আছে — সংজ্ঞার বাইরে থাকলে প্রত্যাশারও বাইরে থাকা যায়।
কিন্তু মানুষ প্রত্যাশার বাইরে থাকতে পারে না। সে তো মানুষ।
একদিন সে বললো, "তোমাকে একটা কথা বলবো।"
আমি অপেক্ষা করলাম।
সে বললো না।
পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। জানালার বাইরে বাতাস বইলো, কৃষ্ণচূড়ার একটি কমলা পাপড়ি কাচে এসে আটকালো — তারপর পড়ে গেলো।
সে বললো, "থাক।"
"থাক" শব্দটি বাংলা ভাষার সবচেয়ে নিষ্ঠুর শব্দ। এটি একইসঙ্গে স্বীকারোক্তি এবং প্রত্যাহার। এটি বলে — আমি বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বলবো না। এটি শোনায় — তুমি জানো আমি কী বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমিও শুনবে না। "থাক" হলো দুটি মানুষের পারস্পরিক চুক্তি — নীরবতার।
আমি সেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলাম। নিঃশব্দে।

চতুর্থ বর্ষ। শেষ সেমিস্টার। গ্রন্থাগারে আসা কমে গেলো — তার, আমার, সবার। পরীক্ষা, ভাইভা, সার্টিফিকেট — এসব শব্দ ঢুকে পড়লো আমাদের শব্দভাণ্ডারে, আর কবিতা, গল্প, জানালা — এসব ধীরে ধীরে প্রান্তিক হলো। জীবন তার নিজের সম্পাদনা নিজে করে — আমরা কেবল পাণ্ডুলিপি।
শেষ দিন। গ্রন্থাগার প্রায় ফাঁকা। আমি গেলাম তৃতীয় তলায়। জানালার পাশে। চেয়ারটি ছিলো। টেবিলটি ছিলো। কৃষ্ণচূড়াটি ছিলো — এবার গাঢ় লাল, যেন ক্রোধে, যেন প্রতিবাদে, যেন শেষবারের মতো কিছু একটা বলতে চাইছে।
সে এলো।
কিছুক্ষণ বসলো। নোটবইটি বের করলো। একটি পাতা ছিঁড়লো। আমার দিকে এগিয়ে দিলো।
আমি নিলাম।
সে উঠে গেলো। দরজার কাছে একবার থামলো — যেমন একটি বাক্য দাঁড়ির কাছে এসে থামে, কিন্তু দাঁড়ি পড়ে না, তিনটি বিন্দু পড়ে...
তারপর চলে গেলো।

কাগজটি আমি সেদিন পড়িনি।
সেদিন রাতে পড়িনি। পরদিন পড়িনি। পরের সপ্তাহেও না।
কাগজটি আমার বইয়ের ভেতর রইলো — একটি চিরস্থায়ী পৃষ্ঠাসংকেতের মতো, একটি এমন অধ্যায়ে, যেটি আমি পড়তে ভয় পাই।
কারণ আমি জানি — পড়লে শেষ হয়ে যাবে। আর না পড়লে?
না পড়লে সে চিরকাল বলতে থাকবে। চিরকাল সে সেই পাতায় দাঁড়িয়ে থাকবে — গ্রন্থাগারের তৃতীয় তলায়, জানালার পাশে, কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায়, সেপ্টেম্বরের সেই অসম বৃষ্টিতে, শব্দহীন হাসিটি মুখে নিয়ে।
কিছু গল্প শেষ না করাই গল্পকে বাঁচিয়ে রাখে।
আমি কাগজটি পড়িনি।
আজো।

বইটি এখনো আমার শেলফে আছে। কাগজটি এখনো সেই পাতায়। কখনো কখনো রাতে, যখন বৃষ্টি হয় — সেপ্টেম্বরের মতো, সংযত, ক্লান্ত — আমি বইটি টেনে আনি। ধরি। কিন্তু খুলি না।
কারণ কিছু কিছু জিনিস স্থগিত অবস্থাতেই সবচেয়ে সুন্দর।

© সাদমান জাওয়াদ
Search Website

Search

Explore

Categories

Explore

Tags

Subscribe

Newsletter

WhatsApp Google Map

Safety and Abuse Reporting

Thanks for being awesome!

We appreciate you contacting us. Our support will get back in touch with you soon!

Have a great day!

Are you sure you want to report abuse against this website?

Please note that your query will be processed only if we find it relevant. Rest all requests will be ignored. If you need help with the website, please login to your dashboard and connect to support